২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলতে নিষিদ্ধ করেছিল জাতিসংঘ

print
নিউইয়র্ক: মায়ানমারে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা রোহিঙ্গা সংকটে যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারই সাবেক সহকর্মীরা। সাবেক কয়েকজন জাতিসংঘ কর্মকর্তা এবং ত্রাণ কর্মী বলেছেন, তিনি জাতিসংঘের অফিসে এমনকি রোহিঙ্গা নিয়ে কোনো কথা বলতে পর্যন্ত বারণ করেছিলেন।

শরণার্থীদের অধিকারের বিষয় মায়ানমার সরকারের কাছে উত্থাপনেও তিনি বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মায়ানমারে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার সূত্রগুলো এই অভিযোগ করেছে। খবর বিবিসির।

জাতিসংঘের একজন সাবেক কর্মকর্তা এমনকি অভিযোগ করেছেন যে মায়ানমারে জাতিসংঘের প্রধান কর্মকর্তা মানবাধিকার কর্মীদের রোহিঙ্গা অধ্যূষিত এলাকায় যাওয়া থেকে বিরত রাখতে চেয়েছেন। তবে মায়ানমারে জাতিসংঘ দফতর এই রিপোর্টে উঠে আসা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গত মাসে যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে শুরু করে, তখন থেকে এই সংকট মোকাবেলায় সামনের কাতারে আছে জাতিসংঘ। শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ ত্রাণ সাহায্য পাঠিয়েছে এবং মায়ানমারের কর্তৃপক্ষের নিন্দা করে কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে।

কিন্তু এই সংকটের পূর্ববর্তী চার বছর ধরে মায়ানমারে জাতিসংঘের কার্যক্রমের প্রধান রেনাটা লক ডেসালিয়েন রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে ভূমিকা পালন করেন, তা নিয়ে অনেক অভিযোগ তুলেছেন তারই প্রাক্তন সহকর্মী এবং বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য রেনাটা লক ডেসালিয়েন এর আগে বাংলাদেশেও জাতিসংঘের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

কানাডার নাগরিক রেনাটা লক ডেসালিয়েনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে:

১. রোহিঙ্গাদের এলাকায় মানবাধিকার কর্মীদের যেতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা।
২. রোহিঙ্গাদের নিয়ে জনমত গড়ে তোলার কর্মসূচী বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা।
৩. রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের চেষ্টার ব্যাপারে সতর্কবাণী দিয়েছেন যেসব কর্মকর্তা, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেষ্টা করা।

মায়ানমারে কাজ করেছেন এমন একজন ত্রাণ কর্মকর্তা ক্যারোলাইন ভ্যানডেনাবিলি জানিয়েছেন, জাতিগত নির্মূলের চেষ্টা কিভাবে শুরু হয়, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার আছে। রোয়ান্ডার গণহত্যার আগে ১৯৯৩-৯৪ সালে তিনি সেখানে নিজের চোখে দেখেছেন কী ঘটেছে। তিনি যখন মায়ানমারে এসে পৌঁছান, তখন সেখানেও এই একই প্যাটার্ন তার চোখে পড়েছে।

‌‘মায়ানমারে একদল বিদেশি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা এবং রাখাইন বিষয়ে কথা বলছিল। আমি সেখানে ছিলাম। সেখানে একজন বার্মিজ বললো, রোহিঙ্গারা যদি কুকুরের মতো হয় ওদের সবাইকে মেরে ফেলা উচিত। কোন সমাজে যখন একটি গোষ্ঠীকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং সেটি যখন সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার বলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়, আমার কাছে এটাই জাতিগত নির্মূল শুরুর একটা আলামত।’

ক্যারোলাইন ভ্যানডেনাবিলি এর আগে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, রোয়ান্ডা এবং নেপালে কাজ করেছেন। ২০১৩ সাল হতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি মায়ানমারে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের দফতরের প্রধান ছিলেন তিনি। রেনাটা লক ডেসালিয়েন হচ্ছেন বর্তমানে আবাসিক সমন্বয়ক।

রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যখন জাতিসংঘ কাজ করছে, তখন সেটি একেবারে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন ক্যারোলাইন ভেনডেনাবিলি।

২০১২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিম এবং রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যে সংঘাতে নিহত হয়েছিল প্রায় একশ’ এবং সিটওয়ে শহরের আশে-পাশের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয় এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

এরপর মাঝেমধ্যেই সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের চেষ্টায় বাধা দিয়েছে রাখাইন বৌদ্ধরা। এমনটি তারা রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণবাহী গাড়ি বহরের পথ রোধ করেছে। ত্রাণবাহী গাড়িতে হামলা চালিয়েছে।

জাতিসংঘ এবং ত্রাণ সংস্থাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠলো। রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ সাহায্য পাঠানোর জন্য জাতিসংঘের একই সঙ্গে মায়ানমার সরকার এবং স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাহায্য দরকার। অন্যদিকে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এটাও বুঝতে পারছিলেন যে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব নিয়ে কথা বললে সেটা মায়ানমারের অনেক বৌদ্ধকে ক্ষিপ্ত করতে পারে।

এ অবস্থায় জাতিসংঘ একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের সিদ্ধান্ত নেয়। রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, যদি সেখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়, তাতে রোহিঙ্গা আর বৌদ্ধদের মধ্যে উত্তেজনা কমে আসবে।

কিন্তু এর ফল দাঁড়ালো এই, রোহিঙ্গা বিষয়ে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা আর প্রকাশ্যে কোন কথা বলতে চায় না। রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলা যেন একটা ‘নিষিদ্ধ’ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। জাতিসংঘের প্রেস বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রোহিঙ্গা শব্দের ব্যবহারই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। মায়ানমারের সরকারও রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার করে না। তারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গালি’ বলে।

আমি যখন মায়ানমার থেকে রিপোর্ট করতাম, তখন খুব কম জাতিসংঘ কর্মীই আসলে অকপটে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইতো। কিন্তু এখন একটি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে এমনকি রুদ্ধদ্বার কক্ষেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে একপাশে সরিয়ে রেখেছিল জাতিসংঘ।

মায়ানমারে কর্মরত ত্রাণকর্মীদের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ পর্যায়ের জাতিসংঘ বৈঠকে মায়ানমারের কর্তৃপক্ষকে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কোন প্রশ্ন করা রীতিমত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

ক্যারোলাইন ভ্যানডেনাবিলি বলেন, শীঘ্রই এই বিষয়টি সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যায় যে উচ্চ পর্যায়ের জাতিসংঘ বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলা কিংবা জাতিগত নির্মূল অভিযানের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

‘আপনি হয়তো এটা করতে পারেন, কিন্তু সেটার একটা পরিণতি ভোগ করতে হবে’, বলছেন তিনি। ‘এর অনেক নেতিবাচক পরিণতি আছে। আপনাকে আর কোন সভায় ডাকা হবে না। আপনার ভ্রমণের অনুমতিপত্র ঠিকমত পাওয়া যাবে না। অনেক কর্মী তাদের কাজ হারিয়েছেন। তাদেরকে সভার মধ্যে হেনস্থা করা হয়েছে। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হলো যে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথাই বলা যাবে না।’

এত বিধিনিষেধের পরও যারা এই কাজ বারবার করেছেন, তাদের আলোচনা থেকেই বাদ দেয়া হয়েছে। যেমন জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ বিষয়ক দফতরের (ইউএনওসিএইচএ) প্রতিনিধি।

ক্যারোলাইন ভ্যানডেনাবিলি জানান, তাকে সবসময় নির্দেশনা দেয়া হতো বৈঠকগুলো যেন এমন সময়ে আয়োজন করা হয় যখন ইউএনওসিএইচএ’র প্রতিনিধি শহরে থাকবেন না।

তিনি আরও বলেন, তাকে গন্ডগোল সৃষ্টিকারি বলে চিহ্নিত করা হয় এবং রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলের আশংকা নিয়ে বারবার সতর্ক করায় তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

ভ্যানডেনাবিলি যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন, জাতিসংঘ তার কোন প্রতিবাদ জানায়নি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলতে মায়ানমার সফরে যাওয়া জাতিসংঘ কর্মকর্তাদেরও বারণ করা হতো।

টমাস কুইটানা এখন উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তা। এর আগে তিনি ছয় বছর মায়ানমার বিষয়ে ঐ একই দায়িত্বে ছিলেন।

আর্জেন্টিনা থেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে একবার তার দেখা হয় রেনাটা লক ডেসালিয়েনের সঙ্গে।

‘তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, আপনার উত্তর রাখাইনে যাওয়া উচিত হবে না – দয়া করে ওখানে যাবেন না। আমি তখন জানতে চাইলাম, কেন? এই প্রশ্নের কোন উত্তর ছিল না। তার অবস্থানটা ছিল এ নিয়ে মায়ানমারের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন ঝামেলায় তিনি যেতে চান না।’

‘এটা মাত্র একটা ঘটনা। কিন্তু এ থেকে বোঝা যায় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মায়ানমারে অবস্থানরত জাতিসংঘ দলের কৌশলটা কী ছিল।’

তবে রেনাটা লক ডেসালিয়েনের পরামর্শ উপেক্ষা করে কুইনটানা উত্তর রাখাইনে যান এবং এক্ষেত্রে তিনি মায়ানমারের জাতিসংঘ মিশনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি।

জাতিসংঘের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে আমরা আসলে সেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করছিলাম।’

‘সরকার আসলে খুব ভালো করেই জানে আমাদের কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে কাজে লাগাতে হয় – এবং তারা সেটাই করে যাচ্ছিল। অথচ আমরা কখনোই এ থেকে কোন শিক্ষা নিইনি। আমরা কখনোই মায়ানমারের সরকারের সামনে পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে পারিনি, কারণ তাতে নাকি মায়ানমার সরকার ক্ষেপে যাবে।’

২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিজেই মায়ানমারে তাদের দফতরের কাজ নিয়ে আভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার পর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে। এতে মায়ানমারে জাতিসংঘ দফতরের কাজের কঠোর সমালোচনা আছে।

জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব আন্তনিও গুটেরেস দায়িত্ব নেয়ার পর তার জন্য তৈরি করা এক রিপোর্টেও বলা হয়েছে, মায়ানমারে জাতিসংঘ একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

রেনাটা লক ডেসালিয়েন এখনো মায়ানমারে জাতিসংঘের প্রধান কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন। তার জায়গায় নতুন যে কর্মকর্তার নাম পাঠানো হয়েছিল, মায়ানমার সরকার তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ডেসালিয়েন এখনো তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

রেনাটা লক ডেসালিয়েন এসব বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আর মায়ানমারে জাতিসংঘের দফতরের একজন মুখপাত্র এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কথা বলার বিষয়ে রেনাটা লক ডেসালিয়েন কোন বাধা দিয়েছেন।

তবে অন্য অনেকেই মায়ানমারে জাতিসংঘের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে শ্রীলংকায় জাতিসংঘ যে ভূমিকার জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল, তার অনেক মিল দেখতে পাচ্ছেন।

চার্লস পেট্রি শ্রীলংকায় জাতিসংঘের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে একটি রিপোর্ট লিখেছেন। তিনি মায়ানমারে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। ২০০৭ সালে তাকে মায়ানমার থেকে বহিস্কার করা হয়।

তিনি বলেছেন, মায়ানমারের জাতিসংঘের গত কয়েক বছরের ভূমিকা বিভ্রান্তিকর। জাতিসংঘ কি মায়ানমারে কোন ভিন্ন কৌশল নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেতো?

ক্যারোলাইন ভ্যানডেনাবিলি মনে করেন, অন্তত তিনি যেসব আগাম সতর্কবাণীর কথা বলেছিলেন, তা আমলে নিলে হয়তো সবাই আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে পারতো কী ঘটতে চলেছে।

একটি সূত্র বলছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে যেভাবে মায়ানমারে জাতিসংঘ কাজ করেছে, তার জন্য একটি আভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি।

মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner

আর্কাইভ

জুন ২০১৮
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০