২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আফগান নীতি মুখরক্ষার কৌশল মাত্র

print
কাবুল: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আফগান নীতি শোনার জন্য দক্ষিণ এশিয়াবাসীর আগ্রহের কমতি ছিলো না। কিন্তু ২১ আগস্ট যখন এই নীতি ঘোষণা করা হলো তখন দেখা গেলে এতে নতুন কিছুই নেই। আফগানিস্তানে আরো মার্কিন সেনা পাঠানো হবে, আর ভারতকে আরো প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখতে বলা হলো, যা ভারত আগে থেকেই করছিলো।

আগে পাকিস্তানকে আরো বেশি কিছু করতে বলা হতো, এখন ভারতকে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন সিনেটরের এই মন্তব্য। কিন্তু নতুন এই নীতিতে আসলেই কিছু সারবস্তু আছে, নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে হম্বিতম্বি করে ১৬ বছর যুদ্ধ চালিয়েও হারতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র মুখরক্ষা করতে চেয়েছে মাত্র।

আগেও পাকিস্তানের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু এবার অনেকটা খোলামেলাভাবে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ন্যাটো-বহির্ভুত মিত্র এবং মার্কিন ‘সন্ত্রাস বিরোধী’ যুদ্ধে একটি ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র। এই দেশটিকেও একদা ‘আরো বেশি কিছু করো’ শ্লোগান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে।

তালিবানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। উল্টো মাঠের পরিস্থিতি তালিবানদের অনুকূলে। তালিবানদের প্রত্যয় জন্মেছে যে তার জয়ী হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পক্ষেও সাহায্য করা কঠিন। ইসলামাবাদ এখন বড়জোর তালিবানদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারে।

নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা সমর্থন প্রদানের আগে পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে পাকিস্তানের মাটিকে যুদ্ধ টেনে আনা সে চায় না। দেশটিকে কিন্তু ঠিকই আশঙ্কা মতো ফল ভোগ করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জারব-ই-আযব, রাদ-উল-ফাসাদ’র মতো কঠোর অপারেশনের মধ্য দিয়ে দেশটি তার সীমান্ত এলাকা থেকে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করেছে। ফের সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানে ফিরে আসুক, ইসলামাবাদ তা চায় না। সে কারণেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আন্তরিক হওয়ার কারণেই দেশটি আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সে যে তার ভূখণ্ডকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় বানাতে চায় না, এটা তারও প্রমাণ।

অন্যদিকে, সীমান্তে বেড়া দেয়া বা চেক পয়েন্টে কড়াকড়ি করার বিরোধী আফগানিস্তান। এতেই বুঝা যায় সমস্যা কোথায়। বেড়া দেয়া শেষ হলো, আরো সীমান্ত চৌকি স্থাপনের পর পরস্পরকে দোষারোপ করার এই খেলা শেষ হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হয় তাহলে তাকে পাকিস্তানের এই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে সমর্থন দিতে হবে।

পাকিস্তান শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চাইলে কিছু বহিঃশক্তি বার বার এই প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছে। যখনই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তখনই কোনো না কোনোভাবে তা বানচাল করা হয়েছে।

‘লুজিং আফগানিস্তান’ বইয়ে নোয়া কোবুর্ন লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে আর্থিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে অনেক ব্যক্তি ও গ্রুপ। এরা তাদের অবস্থান বজায় রাখতে সহিংসতার পক্ষে সবসময় কথা বলে যাবে।’

সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধ শেষ করতে চাইবে না। কারণ, আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার মতো দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের উপস্থিতি ও স্বার্থের অবসান। তারা চীনকে এর সুযোগ গ্রহণ করতে দিতে চাইবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি হিসেবে ভারত ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু চীন যখন এশিয়ার শক্তিশালী নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে তখন দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব হাত ছাড়া করতে চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া ইরাকে পরাজয়ের পর দেশটি একই ধরনের অপমান কামনা করবে না।

আফগান সমস্যার একমাত্র সমাধান রাজনৈতিক। দেশটিতে সেনা আনা-নেয়া করে এ পর্যন্ত কিছু হাসিল হয়নি। এই যুদ্ধে যে জয়ী হতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্র তা জানে। কিন্তু নিজের উপস্থিতি বজায় রাখতে এই নতুন নীতির ঘোষণা।

সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের ব্যাপক অবদান সত্ত্বেও ইসলামাবাদকে দায়ি করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের কাছে অবাস্তব দাবিও করছে। পাকিস্তানকে দায়ি করলে প্রত্যাশিত ফল আসবে না।

আফগানবাসীর দুঃখ না ঘোচার কারণ বৈশ্বিক খেলোয়াড়রা তাদের অবস্থান ছাড়তে নারাজ। তালিবানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি – আলোচনার কথা বলে সেনা অভিযান চালানো – কাজ করবে না।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র কমব্যাট মিশন শেষ করার ঘোষণা দেয়া এবং বলে আফগানিস্তান থেকে ধাপে ধাপে সেনা সরিয়ে নেয়া হবে। এখন নতুন করে সেখানে সেনা পাঠাচ্ছে। এই নীতি কাণ্ডজ্ঞানহীন। পাকিস্তান, ইরান, চীন ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক খেলোয়াড়দের নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner

আর্কাইভ

জুন ২০১৮
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০