০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

নার্স আর দালাল দিয়ে চলছে বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

print

1-104নূরনবী আহমেদঃ ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এ হাসপাতালে মূলত অ্যাজমা, টিবি, চেস্ট সার্জারি প্রভৃতি রোগের চিকিৎসা করানো হয়ে থাকে। এছাড়া এখানে অধিকাংশ রোগের বিভিন্ন ধরনের টেস্ট স্ল্পবব্যয়ে করার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে বহির্বিভাগে রোগী দেখানোর জন্য টিকিটের মূল্যে রাখা হয় মাত্র ১০ টাকা এবং রোগীর ভর্তি ফি মাত্র ১৫ টাকা। এখানে দুই ধরনের কেবিন ব্যবস্থা আছে, পেইং কেবিন ২২৫ টাকা এবং কিছু দরিদ্রদের জন্য ফ্রি যেখানে কোনো টাকা রাখার বিধাননেই। অথচ এই হাসপাতালে টাকা ছাড়া কোন কাজই হয়না। আর সরকারি হাসপাতাল মানেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এবং সুচিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। আর এ কারণেই মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক বা মেডিকেলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যদিও এর জন্য তাদের অনেক বেশি টাকা গুনতে হয়। তারপরও মানুষ সুচিকিৎসার নিশ্চিয়তা চায়।
অভিযোগ উঠেছে, স্মপ্রতি সরকার সমর্থিত কতিপয় চিকিৎসক-কর্মচারীর দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা বেড়ে গেছে এই হাসপাতালে। এই অসৎ চিকিৎসক-কর্মচারী সিন্ডিকেটের কাছে রোগীরা পুরোপুরি জিম্মি। হাসপাতালে সব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্তে¡ও ওইসব রোগীর নানা টেস্টের নামে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। এই হাসপাতালে শুধু দলীয় পরিচয়ে পদোন্নতি পাওয়া চিকিৎসকরা আছেন বহাল তবিয়তে। অনেক চিকিৎসক শুধু ডিপ্লোমাডিগ্রি নিয়ে সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক হয়েছেন। কিন্তু অনেক এমডিএমএস ও এফসিপিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসককে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাক্সগুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন কতিপয় চিকিৎসক। এই হাসপাতালে দেশের দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা এসে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে উল্টো চিকিৎসক-কর্মচারীদের খারাপ আচরণে চোখের জল ফেলছেন। এই হাসপাতালে প্রতিদিন বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা ওত পেতে রয়েছে রোগী ধরার জন্য। এদের প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছেন হাসপাতালের সরকার সমর্থিত কতিপয় অসৎ চিকিৎসক-কর্মচারী। অনেক সময় রোগীর অজান্তেই হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানোর জন্য এসব চিকিৎসক-কর্মচারী রোগীকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, মূলত প্রাইভেট র্প্যাকটিসের রোগী ধরার জন্যই অনেক চিকিৎসক বহির্বিভাগে পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করেন। আর এদের দালাল হিসেবে কাজ করে হাসপাতালের কর্মচারীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ২০ জন রোগীর এক্স-রে করার নিয়ম আছে। এই সুযোগে কতিপয় দুর্নীতিবাজ চিকিৎসক রোগীদের বিভিন্ন টেস্ট করাতে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। জানা গেছে, হাসপাতালে যে এক্স-রে করাতে ৫৫ টাকা লাগে সেটার জন্য কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে লাগে কমপক্ষে১৫০ টাকা। এভাবে রোগীরা প্রতিনিয়ত অর্থসহ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গতকাল সরেজমিনে গিয়েছিলাম ঢাকার বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। হাসপাতালের গেটেই বসে ছিলেন নেত্রকোনা থেকে স্বামীকে দেখতে আসা শামিমা। তার রোগী স¤পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিয়ে গেলেন তার জামাই মোহসীন এর কাছে। মোহসীন থাকেন কচুক্ষেতে এবং রিক্স্রা চালানোর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তার সমস্যা হলো পেটে পানি জমেছে। এমনই আর একজন ভুক্তভোগী হলেন শামিম, বাড়ি দিনাজপুর, পেশায় একজন পানের কৃষক। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসার জন্য। তার আর্থিক অবস্থা জানতে চাইলে বলেন, তিনি বেসরকারি সংস্থা ব্রাক ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তার স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে এখানে এসেছেন। তিনিও একই কথা বললেন, এখানকার ডাক্তাররা প্রতিদিন একবার করে এসে হাজিরা দিয়ে যান। আর বিভিন্ন টেস্ট তো আছেই তবে কবে অপারেশন হবে সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। অর্থাৎ হাসপতালে আসলে যে কোনো রোগীর জন্য এক থেকে দুই মাস থাকতেই হবে। কিন্তু এ সময় এ গরিব পরিবার কীভাবে চলবে তার উত্তর কারো জানা নেই। এসব ভুক্তভোগীদের একটাই চাওয়া যেন তাদের দ্রত চিকিৎসা করানো হয়। কারণ এখানে থাকা মানেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিবারের জন্যও অনেক যন্ত্রণার ব্যাপার। এমনই একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ নাম দোলোয়ার হোসেন। তিনি টিবি রোগে ভুগছেন, নরসিংদী সরকারি হাসপাতাল তাকে কয়েকটা টেস্টের জন্য এই বক্ষব্যাধি হাসপাতালে রেফার করেছেন। তিনি এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই ঘোরেন তার টেস্টগুলোর জন্য কিন্তু এখনো করানো সম্ভব হয়নি। সার্বিকভাবে অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘসূত্রিতাই যেন এখানকার একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলাম বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এর সঙ্গে কিন্তু তিনি হাসপাতালের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া হাসপাতালের কয়েকজন অফিস সহকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, অপারেশন মেশিন থাকলেও অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তবে হাসপাতাল চত্বরে একটি নিয়মিত চিত্র দেখা গেল যে, এখানে প্রায় কয়েকশ ওষুধ প্রতিনিধি মোটরসাইকেলসহ দাঁড়িয়ে আছে। আর এসব প্রতিনিধির অন্যতম কাজ হলো ডাক্তারদের বিভিন্নভাবে খুশি করানোর মাধ্যমে ডাক্তারদের প্রদেয় প্রেসক্রিপসনে তাদের কো¤পানির ওষুধ লেখানো।

মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner

আর্কাইভ

মে ২০১৮
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১